জিদনি নামের একটি মেয়ে ছিল

ভালবাসার গল্প
Imran Khan || 04 March, 2018 ! 8: 54 am

জিদনি নামের একটি মেয়ে ছিল, আমাকে ভাইয়া বলে ডাকত। আমাদের এলাকার ভাড়াটিয়া। তার উচ্চতা ছিল সাড়ে চার ফুট। তাকে ধান মরিচ বলে ডাকতাম। ধান মরিচ ডাকার অবশ্য একটা কারন আছে। দেখতে লম্বায় ছোট হলেও তার মাঝে অনেকগুলো গুণ ছিল।
প্রথম গুণ ছিল সে সবার সাথে খুব সহজেই মিশতে পারত। সবার মন জয় করা মত এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তার। গান গাইতে পারত। নাচতে পারত। আর যখন এলাকায় প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করি তখন তার গজল শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। খুব দরদ ছিল তার সুরে।
.
মেয়েটি আমাকে ভাইয়া ডাকার বিশেষ কোন কারন ছিলনা। ঐ যে সবার সাথে মিশতে পারে। দেখা হলে সারাক্ষন মুখে ভাইয়া ডাকটা লেগেই থাকত। এত মুগ্ধ ছিলাম তার প্রতিটি গুণে গুণান্বিত হয়ে যে আমি গভীর রাতে তাকে নিয়ে মনের ভিতর কিছু একটা সাজানোর চেষ্টা করতাম। সকালে তার ভাইয়া ডাকেই সেই সাজ নষ্ট হত।
ওর ভাইয়া ডাকটাও এত মধুর ছিল যে ঐ ডাকটিই আমাকে তার প্রতি প্রেমে পড়তে দেয়নি। দেখতে উজ্জল শ্যামবর্ণ, অতটাও সুন্দরনা। তবে তার সুন্দরের ঘাটতি নেই অন্যান্য গুণে। প্রথম দিকটায় যখন আম্মু বলত, “দেখেছিস জিদনি মেয়েটা কত লক্ষ্মী? ওর মত একটা লক্ষ্মী বউ লাগবে আমার।”
তখন মনে দিল্লীকা লাড্ডু ফুটত। আর যখনই জিদনির ভাইয়া ডাক কানে ভেসে আসত তখন আমার মুখখানা হাওয়া ছাড়া বেলুনের মত চুপসে যেত। শেষ অবধি আর তার প্রেমে পড়া হয়নি। সে নিজেই প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করেছিল।
আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। জিদনি পালিয়ে বিয়ে করার মত মেয়ে ছিলনা। তাহলে পালাল কেন?
সে রহস্য হয়ত ভাইয়াদের জানার কথা না। তাই আর কখনো জানা হয়নি।
.
.
বড় রাস্তা থেকে যখন দুপুরবেলা রিক্সা না পেয়ে বাড়ি ফিরলাম। তখন পাশের বাড়াটিয়া বাড়ির এক মহিলা বলতেছে, “আমার স্বামীতো দেশের বাড়ি গেছে, রিক্সাতো পড়েই আছে। দরকার লাগলে নিয়ে যাননা।”
আম্মু শুনে বলতেছে সেটাই ভাল হবে। আজ ভাঙ্গানো না হলে আবার কবে যেন সুযোগ হয়।
ধান ভাঙ্গাতে হবে। ধান বস্তায় ভরে রেখেছে। এখন রিক্সা করে মেশিন ঘরে নিতে হবে।
যাই হোক, একদিনের জন্য নাহয় রিক্সাওয়ালা হইলাম।
একবার ধান মেশিন ঘরে রেখে দ্বিতীয়বার নেয়ার জন্য খালি রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। মধ্যপথে হঠাৎ এক মেয়ে দ্রুত এসে বলতেছে, “এই দাড়ান দাড়ান।”
বলেই রিক্সায় উঠে গেছে।
বলতেছে, “দুপুর বেলা একটা রিক্সাও নেই, একটু সরকার বাড়ি নামিয়ে দিন।”
মেয়েটির চেহারা এতটাই মায়াবী ছিল যে আমি মুখ ফুটে বলতে পারিনি যে আমি রিক্সাওয়ালা না। আপনি আমার রিক্সা থেকে নেমে যান।
তার উপর দুপুরের কড়া রোদে মেয়েটিকে দাড় করিয়ে চলেই বা যাই কিকরে? আর সরকার বাড়িটা আমাদের ঘরের সাথেই। তাই আর কিছু না বলে মেয়েটিকে নিয়ে রিক্সা চালিয়ে আসতেছি। মনে মনে গানটা অজান্তেই মনে পড়ে গেল,
“অ সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে, আমি এহন রিক্সা চালাই নসন্দী (নরসিংদী) শহরে।”
.
রিক্সা থেকে মেয়েটি নামার পর আমি সে রিক্সা নিয়ে আমাদের বাড়ি আসলাম। পেছন থেকে মনে হয় রিক্সা ভাড়া আনার জন্য ডেকেছিল। আমি পিছন ফিরে তাকাইনি। আমি কি রিক্সাওয়ালা নাকি যে ভাড়া আনব?
দুপুরে ঘর্মাক্ত শরীর আর ধান, চাউলের কুঁড়া থেকে শরীরে এমন অবস্থা ছিল যে আমাকে চেনার উপায় ছিলনা। মনে মনে ভাবতেছি, অতটা সুন্দর না হলেও দেখতে তো আমি খারাপ না। আজ যদি ঘর্মাক্ত শরীরে ধান চাউলের কুঁড়ো না থাকত। যদি রিক্সার প্যাডেলে পা না থাকত। তাহলে হয়তো সরকার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়েটির সাথে লাইন মারতে পারতাম। যদিও এটা আমার অভ্যাসে ছিলনা। কিন্তু ঐ যে, মনের ভিতর দিল্লীকা লাড্ডু ফুটে।
.
বিকেলে একটু মাঞ্জা মেরে বাইরে বের হচ্ছি। এটা নরসিংদী সহ অনেক এলাকায় প্রচলিত বাংলা। যে শব্দটা বইয়ের মধ্যে হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। মাঞ্জা মারা হল কোন উপলক্ষ ছাড়াই নিজেকে একটু আকর্ষনীয় করার লক্ষে একটু সাজগোজ। তবে অবশ্যই মেয়েদের মত ঘন্টাব্যপী না। ছেলেরা পাঁচ মিনিটেই মাঞ্জা মারতে পারে।
তো বাইরে বের হয়ে বড় রাস্তায় উঠার সময় সে মেয়েটির সাথে দেখা। ফোনে কাকে যেন মামা মামা বলে কথা বলতেছে। যাক দূর থেকে ভাবছিলাম মনে হয় প্রেমিক আছে। এখন অবশ্য ফোনের কথা শুনে একটু ভাল লাগতেছে। আমাকে দেখে আমার দিকে ঘুরে ফিরে তাকাচ্ছে মেয়েটি। যেন অদ্ভুত কোন জীব দেখতেছে। আমি নিজেই একটু আগ্রহ নিয়ে বললাম, “কিছু বলবেন?”
একটু চুপ করে থেকে বলতেছে,”আসলে আপনার মত দেখতে একজন রিক্সাওয়ালার রিক্সায় চড়ে আসছিলাম। সে ভাড়া না নিয়েই চলে এসেছে।”
-আমাকে দেখে কি আপনার কাছে রিক্সাওয়ালা মনে হয়?
একটু ভাব নিয়েই বলেছিলাম কথাটা। কিন্তু মেয়ের উক্তর শুনে চুপসে গেছি। মেয়েটি বলতেছে, “না মানে তা দেখা যাচ্ছেনা। কিন্তু ঐ রিক্সাওয়ালার কানেও আপনার মত একটি দুল আছে।”
এই সারছে। এখন কি বলব?
-থাকতে পারেনা? কত মানুষই কানে দুল পরে। আমি বাবা মায়ের একটাই ছেলে সেজন্য পরতে হইছে। তাই বলে আমি রিক্সাওয়ালা নাকি?
-না তা হতে যাবেন কেন? কিছু মনে করবেন না।
-কোথাও বেড়াতে এসেছেন বুঝি?
-হ্যাঁ, সরকার বাড়িতে।
-ও হ্যাঁ, আমাদের পাশের বাড়িই।
-আচ্ছা আসি তাহলে।
তখন ততটুকু কথা বলেই শেষ। যাক মনে কোন কিছুর উদয় হচ্ছে মনে হয়।
.
সরকার বাড়ির বড় মেয়ে রাহেলা আপা। বিয়ে হয়েছে অনেক আগে, দুটো ছেলে মেয়েও আছে। বাবার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল চারদিন আগে। আমাকে দেখেই ডাকতেছে। উনার পাশেই সেই মেয়েটি দাড়ানো। এগিয়ে গেলাম আস্তে আস্তে, নিতান্তই ভদ্র ছেলের মত।
-ভাই আমার একটা কাজ করে দিবি?
-অবশ্যই আপা বলেন।
-শ্বশুর বাড়ি থেকে ভাগনিটা আসছে, তার ফোনের টাকা শেষ। একটু ফ্লেক্সিলোডের দোকানে যেতে হবে।
পাশ থেকে মেয়েটি বলে উঠল, “মামা একটু কষ্ট করে যাবেন?”
আমার মুখের ভাষা হারিয়ে গেছে। রাহেলা আপার হাত থেকে টাকা আর নাম্বার লেখা কাগজের টুকরো নিয়ে রওনা দিলাম। তখনো আমার মুখে ভাষা নেই। নির্বাক পথ চলতেছি।
দুদিন ধরে মনের ভিতর দিল্লীকা লাড্ডু ফুটাইলাম আর এখন পরিচয় করাইছে আমি মেয়েটার মামা। দুঃখের মাঝ নদীতে আছি। রিক্সা ভাড়াটাও নেয়া দরকার ছিল। পুরাই লস হইয়া গেল।
.
.
লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,,,,
,,,,,,ওমর ফারুক শ্রাবণ

Post Reads: 1363 Views