বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা কেন ?

অন্যান্য খবর বাংলাদেশর খবর মিডিয়া সংবাদ
Razia Aktar Moni || 08 December, 2020 ! 10: 00 am

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা কেন ?
————————————-
ভাস্কর্য অতি প্রাচীন শিল্পরীতি। সভ্যতার প্রাথমিককাল থেকেই শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমে মানব ইতিহাসের বিভিন্ন দিক চিত্রিত হয়েছে। ভাস্কর্য শিল্প তার অন্যতম মাধ্যম। মুসলিম বিশ্বসহ পৃথিবীর সব দেশেই কোনো না কোনোরূপে ভাস্কর্যশিল্প চর্চা হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি অসংখ্য ভাস্কর্য তৈরি হয়েছে। ভাস্কর্য মূর্তি নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পরীতি। বর্তমান প্রবন্ধটি একটি গোষ্ঠী কর্তৃক দোলাইপাড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার স্বরূপ উন্মোচনের প্রচেষ্টা।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। যেমন, মুসলিম বিশ্বে ভাস্কর্য শিল্প চর্চা হয় কিনা? দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যই কি প্রথম নাকি আরও ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে? তৃতীয়ত, সুনির্দিষ্টভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতার কারণ কী এবং বিরোধিতাকারীদের উদ্দেশ্য কী?
প্রথমেই বলতে চাই, সব মুসলিম দেশেই কোনো না কোনো ফর্মে ভাস্কর্যশিল্পরীতি চর্চা হয়ে থাকে। ভাস্কর্য, ম্যুরাল, গুহাচিত্র, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, শিলালিপি ইত্যাদি বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস গবেষণার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান। প্রাচীন মিসরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতার ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনও উদ্ঘাটিত হচ্ছে এসব শিল্প-উপাদান স্টাডি করে। যারা এ শিল্পের বিরোধিতা করছেন, তারা মুসলমানদের আদর্শ রাষ্ট্ররূপে পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার মানস পুরুষ আল্লামা ইকবাল এবং পাকিস্তানের মহান নেতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহকে হৃদয়ে লালন করেন। পাকিস্তানকে এখনও তারা মুসলমানদের জন্য আদর্শ রাষ্ট্ররূপে গণ্য করেন। তারা কি জানেন সেই মুসলমানদের আবাসভূমি পাকিস্তানে কতশত ভাস্কর্য আছে? গত ১৫ মার্চ ২০১৮ সালের দৈনিক ডনের রিপোর্টে আল হামারা কালচারাল কমপ্লেক্সের লনে কায়েদে আজমের ভাস্কর্য উদ্বোধনের খবর প্রকাশিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে লাহোর আর্ট কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর ক্যাপ্টেন মুহম্মদ আতা খান বলেছেন, ‘আমরা আল হামারা প্রাঙ্গণ এবং আল হামারা কালচারাল কমপ্লেক্সে আল্লামা ইকবালের দুটি ভাস্কর্য স্থাপন করেছিলাম। কিন্তু কায়েদে আজমের ভাস্কর্য ছাড়া এটি অসম্পূর্ণ লাগছিল।’ এ ছাড়া ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্তৃক সাদ্দাম হোসেনের একটি ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার চিত্র টেলিভিশনে দেখে সবাই ব্যথিত হয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, মার্কিন বাহিনী কর্তৃক সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য ভাঙায় উগ্রবাদীরা কি তখন খুশি হয়েছিলেন? ওটি ভাস্কর্যই ছিল। আর সাদ্দাম হোসেন মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। মধ্যযুগে মিসরে আইয়ুবি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সালাহ্‌ উদ্দিন আইয়ুবি ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বীরতত্ত্ব প্রদর্শন করে যুদ্ধে জয়লাভ করে গাজি উপাধি পেয়েছিলেন। মুসলিম দেশ মিসরের ‘ইজিপশিয়ান মিলিটারি মিউজিয়াম’ কায়রোতে সালাহ্‌ উদ্দিন আইয়ুবির ভাস্কর্য আজও শোভা পাচ্ছে। এ ছাড়া বিজয়ীর বেশে সালাহ্‌ উদ্দিনের অনেক ভাস্কর্য মিসর-সিরিয়া অঞ্চলজুড়ে রয়েছে। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আমাদের সামনে আছে।
বাংলাদেশে এর আগেও বহু ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। সারাদেশে স্বাধীনতার স্মারক ভাস্কর্য, ম্যুরাল আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে। আর মুজিবনগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের অনেক জায়গায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এখন কেন বিরোধিতা? বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগত জীবনে গভীর অনুরাগ ও বিশ্বাসসম্পন্ন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে দেখা যায়, তিনি চীন সফরকালে সেখানকার স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ধর্ম-কর্ম পালনে চীন সরকারের তরফ থেকে কোনো বাধা আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করছেন। তিনি তো তখন রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। অথচ কত গভীর অনুরাগে তিনি চীনা মুসলিম ভাইদের খোঁজখবর নিয়েছেন!
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য তিনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বন্ধুপ্রতিম দেশের বাধা উপেক্ষা করে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে তিনি যোগদান করেছেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে তিনি এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনে স্বস্তি এনে দিলেন। মুসলিম বিশ্বের সমর্থন আদায়েও সফল হলেন। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রথম পর্যায়েই বঙ্গবন্ধু ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা মানুষকে যুক্তিবাদী করে। অসম্পূর্ণ জ্ঞান মানুষকে অন্ধ করে- এ সত্য উপলব্ধি করেই বঙ্গবন্ধু ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সঠিক জ্ঞানচর্চার জন্য এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। আবার বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার শাসনকাল পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, বাংলাদেশের ধর্মীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে অবহেলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কওমি মাদ্রাসা সার্টিফিকেটের স্বীকৃতির ব্যবস্থা তিনিই করেছেন। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের অধীনে এনেছেন। তিনি সারাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের ব্যবস্থা করেছেন। সারাদেশে মডেল মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আর ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন ধর্মানুরাগী মানুষ। তথাপি বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনাকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে তার শাসনকালকে বাধাগ্রস্ত করতে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে নানাভাবে উস্কানি দিয়ে চলেছে। হেফাজতে ইসলাম নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
এ কথা স্পষ্ট যে, যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করছে, তাদের সূদুরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। এটাই সত্য, ভাস্কর্য ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য দলিল।
অতীতের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ধর্মের মুখোশের অন্তরালে একটি গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য অনুকূল সময়ের অপেক্ষায় থাকে। কোনো কোনো দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনে তারা অনুপ্রাণিত হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উপস্থিতি জানান দেওয়ার একটি হীন প্রচেষ্টা। হেফাজতে ইসলাম এক ধরনের আত্মপরিচয় সংকটের মধ্যে রয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফীর মৃত্যু এবং সংগঠনের দখলদারিত্বকে কেন্দ্র করে ওই সংগঠনটি দ্বিধাবিভক্তির সংকটে পড়েছে। ভাস্কর্য বিরোধিতার নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধিতা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামীবিরোধী সব শক্তির নৈতিক সমর্থন আদায় তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
ভাস্কর্য বিরোধিতার নামে তারা রাষ্ট্রের মৌলিক জায়গায় হাত দিয়েছে। দেশে যুগ যুগ ধরে ভাস্কর্যশিল্প চর্চা হচ্ছে, তাতে তো এদেশের মানুষের ধর্মীয় চর্চায় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। তবে কেন হঠাৎ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য হয়ে গেল ‘মূর্তি’? বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় যেমন জাতির কাছে প্রেরণার উৎস ছিলেন, তেমনি এখনও তিনি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন ক্রমান্বয়ে। শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর সব মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎসরূপে বঙ্গবন্ধু বিরাজিত হবেন সর্বকালে। অতীতে বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এবারও উগ্রবাদীদের এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে। উগ্রবাদীদের এখনই দমন করা দরকার। এরা একটু একটু টোকা দিয়ে দেখছে। এই প্রচেষ্টা সফল হলে ঘাপটি মেরে থাকা কায়েমি স্বার্থবাদী শক্তির উত্থান ঘটবে। এ ব্যাপারে সরকারের যেমন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রযোজন, তেমনি উগ্রবাদের বিরুদ্ধে প্রবল সামাজিক জনমতও গড়ে তোলা প্রয়োজন।

#লেখকঃ ড. মো. আবদুর রহিম সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Comments

Post Reads: 200 Views